আজানের ধ্বনিতে জেগে ওঠে পৃথিবী, জেগে ওঠে পদ্মজা। বিছানা থেকে উঠতে গিয়েও উঠতে পারল না। আমির দুই হাতে জাপটে ধরে রেখেছে তাকে। পদ্মজা আমিরকে মৃদু কণ্ঠে ডাকল, ‘এই যে, শুনছেন?’


আমির সাড়া দিল না। আবার ডাকল পদ্মজা। আমির ঘুমের ঘোরে কিছু একটা বিড়বিড় করে পুনরায় ঘুমে তলিয়ে যায়। এবার পদ্মজা উঁচু স্বরে ডাকল, ‘আরে উঠুন না। ফজরের নামাজ পড়বেন। এই যে…’


আমির পিটপিট করে চোখ খুলে তাকাল। দুই হাতের বাঁধন আগলা করতেই পদ্মজা আমিরকে ঠেলে দ্রুত উঠে বসে। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, ‘অজু করতে আসুন। আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন আজ থেকে নামাজ পড়বেন।


পদ্মজা দ্রুত কলপাড়ের দিকে যেতে থাকে। সে সবসময় আলো ফোটার আগে ফজরের নামাজ আদায় করার চেষ্টা করে। কলপাড় থেকে অজু করে এসে দেখে, আমির বালিশ জড়িয়ে ধরে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সে মৃদু হেসে কপাল চাপড়ায়। আমিরের পাশে গিয়ে তার চুলে বিলি কেটে দিয়ে কোমল কণ্ঠে বলল, ‘উঠুন না। নামাজ পড়ে আবার ঘুমাবেন। মসজিদে যেতে হবে না, আমার সঙ্গেই পড়ুন। এই যে, শুনছেন? এই যে, বাবু…’


পদ্মজা দ্রুত জিভ কাটল। মুখ ফসকে আমিরের ডাক নাম ধরে ডেকে ফেলল! পদ্মজা সাবধানে পরখ করে দেখল, আমির শুনল কি না! না শোনেনি। পদ্মজা হাঁফ ছেড়ে আরো এক দফা ডাকার পর আমির উঠে বসে। কাঁদো কাঁদো হয়ে অনুরোধ করে, ‘কাল থেকে পড়ব। দয়া করে, আজ ঘুমাতে দাও।’


পদ্মজা তার কথা শুনল না। বরং স্ত্রীর অনুনয়ের কাছে হেরে গেল আমির। সহধর্মিণী যদি এত সুন্দরী হয় তার অনুরোধ কি ফেলা যায়? আমির অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলপাড় থেকে অজু করে আসে। পাশাপাশি জায়নামাজে বসে নামাজ আদায় করল দুজন।


নামাজ শেষ হতেই পদ্মজা তাড়া দিয়ে বলল, ‘এবার চলুন।’


আমির টুপি বিছানার ওপর রেখে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কোথায়?’


অভিমান হলো পদ্মজার, ‘এমনভাবে বলছেন যেন জানেন না!’


আমিরের সত্যি কিছু মনে পড়ছে না। চোখে এখনো ঘুম ঘুম ভাব। সে শুধু ঘুমাতে চায়। পদ্মজার অভিমানী মুখ দেখে মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়তেই বলল, ‘ওহ! দাঁড়াও, চাবি নিয়ে আসছি।’


আমির ঘরের বাইরে চলে যায়। পদ্মজা প্রবল উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে। জানালার পাশে দাঁড়াতেই ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে সর্বাঙ্গ চাঙ্গা হয়ে উঠে। বাইরে সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটেছে। পদ্মজা মুগ্ধ নয়নে দেখছে বাড়ির পেছনের জঙ্গল। কী সুন্দর সবকিছু! এত এত গাছ। অযত্নে গড়ে ওঠা বন-জঙ্গল বোধহয় একটু বেশি আকর্ষণীয় হয়।


প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে আচমকা চোখের তারায় দৃশ্যমান হয় রানি। রানির পরনে আকাশি রঙের সালোয়ার-কামিজ। সে জঙ্গলের ভেতরে যাচ্ছে। চোর চুরি করার সময় যেভাবে চারপাশ দেখে দেখে এগোয় ঠিক সেভাবে চারপাশ দেখে দেখে এগোচ্ছে রানি। পদ্মজা নিশ্বাস বন্ধ করে পুরো দৃশ্যটা দেখল। রানি জঙ্গলের ভেতরে চলে যায়।


পেছন থেকে আমির ডাকল, ‘পদ্মবতী?’


হঠাৎ ডাক শুনে পদ্মজা মৃদু কেঁপে উঠল।


আমির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল, ‘কিছু কী হয়েছে?’


‘না! কী হবে? চলুন আমরা যাই।’ পদ্মজা হাসার চেষ্টা করল।


পদ্মজা যে কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছে আমির। তবে প্রশ্ন করল না। রানির কথা তুলতে গিয়েও তুলল না পদ্মজা। সে ভাবছে, ‘আগে রানি আপাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। এখনই উনাকে বলা ঠিক হবে না। কী ভাবেন আবার!’


রুম্পার ঘরের দরজা খুলতেই ক্যাচক্যাচ আওয়াজ হলো। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নাকে দুর্গন্ধ ঠেকে। পদ্মজা প্রথমে জানালা খুলে দিল। পালঙ্কের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল, সেটি শূন্য। আমিরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে, আমির ইশারা করল পালঙ্কের নিচে দেখতে। পদ্মজা ঝুঁকে পালঙ্কের নিচে দেখে কেউ একজন নিথরের মতো শুয়ে আছে, যেন মৃত লাশ। জট লাগা চুল দিয়ে মুখ ঢাকা, হাতে-পায়ে বেড়ি।


আমির পদ্মজার পাশে বসে জানাল, ‘উনিই রুম্পা ভাবি।’


পদ্মজা ধীর কণ্ঠে অনুরোধ করে, ‘উনাকে একটু ডাকবেন?’


‘রেগে যায় যদি?’


‘তবুও ডাকুন।’


আমির লম্বা করে নিশ্বাস নিয়ে ডাকল, ‘ভাবি? ভাবি? শুনছেন ভাবি?’


রুম্পা নড়েচড়ে চোখ খুলে। দেখতে পায়, দুই হাত দূরে একটা ছেলে ও মেয়ে বসে আছে। তাদের মুখ স্পষ্ট নয়। আলো তখনো ভালো করে ঘরে ঢোকেনি। রুম্পা শান্ত চোখে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। পদ্মজা হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আমার হাতে ধরে বেরিয়ে আসুন।’


রুম্পা বাঁধা দুই হাতে পদ্মজার হাত ধরার চেষ্টা করে, পারল না। পদ্মজা নত হয়ে রুম্পার দুই হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলো। রুম্পা কাছে পৌঁছাতেই দুর্গন্ধে বমি চলে আসে পদ্মজার। গলা অবধি এসে বমি আটকে গেছে। না জানি রূম্পা ভাবি কতদিন গোসল করেনি, দাঁত মাজেনি। এই বাড়ির কেউ কী একটু পরিষ্কার করে রাখতে পারে না? প্রস্রাবের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ঘরেই পায়খানা-প্রস্রাব করে, নয়তো এত বিশ্রী গন্ধ হতো না।


রুম্পা মলিন মুখে চেয়ে আছে পদ্মজার দিকে। শান্ত, স্থির দৃষ্টি। আমি গর্ব করে রুম্পাকে বলল, ‘আমার বউ। বলছিলাম না, সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা আমার বউ হবে। দেখিয়ে দিলাম তো?’


রুম্পা হাসল। আশ্চর্য মায়া সেই হাসিতে! পদ্মজা মুগ্ধ হয়ে দেখল। ময়লাটে মলিন মুখের হাসি বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি। অনেকদিন গোসল না করার কারণে চেহারা-হাত-পা ময়লাটে হয়ে গেছে। নখগুলোও বড়ো বড়ো। নখের ভেতর ময়লার স্তূপ। ঠোঁট ফেটে চৌচির। টলমল করা চোখ। দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি চোখ দিয়ে বর্ষণ বইবে।


রুম্পা পদ্মজাকে শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘এ তো ম্যালা সুন্দর ছেড়ি। তোমার নাম কী গো?’


পদ্মজা এক পলক আমিরকে দেখে জবাব দিল, ‘উম্মে পদ্মজা।’


‘ছুডু ভাই, এত সুন্দর ছেড়ি কই পাইলেন? এ…এ যে চান্দের লাকান মুখ।’


রুম্পার আরো কাছে গিয়ে বসে পদ্মজা। দুর্গন্ধটা আর নাকে লাগছে না। মানুষটাকে তার বেশ লাগছে। রুম্পার কুচকুচে কালো, লম্বা চুল। মাটিতে পাঁচ-ছয় ইঞ্চি চুল লুটিয়ে আছে। অনেকদিন না ধোয়ার কারণে জট লেগে আছে, কিন্তু সৌন্দর্যের অস্তিত্ব এখনো বোঝা যায়। সুস্থ অবস্থায় নিশ্চয় অনেক বেশি সুন্দর চুলের অধিকারিণী ছিল।


পদ্মজা শুধাল, ‘আমি আপনাকে তুমি করে বলি?’


রুম্পা দাঁত বের করে হেসে মাথা নাড়াল।


পদ্মজা হেসে বলল, ‘কিছু বলবেন?’


রুম্পা হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে পদ্মজার দিকে। কোনো জবাব দেয় না। সেকেন্ড কয়েক পর রুম্পার চোখের দৃষ্টি এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। হাসি মিলিয়ে মুখে নেমে আসে আঁধার। হঠাৎই যেন চাঁদের মতো ঝকঝক করা মুখ কলঙ্কে লেপটে দিয়েছে কেউ। পদ্মজা অবাক হয়ে রুম্পার পরিবর্তন দেখতে লাগল।


আকস্মিক তাকে আক্রমণ করে বসল রুম্পা, খামচে ধরল পা। আমির লাফিয়ে উঠে রুম্পার হাত থেকে পদ্মজাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। রুম্পা পা ছেড়ে এবার কামড়ে ধরল পদ্মজার শাড়ি। মুখ দিয়ে ক্ষোভে-আক্রোশে ভাষাহীন শব্দ করতে থাকল।


আমির ধমকে ওঠে, ‘ভাবি ছাড়ো বলছি। পদ্মজা তোমার ক্ষতি করতে আসেনি। ভাবি ছাড়ো।’


পদ্মজা স্তব্ধ হয়ে দেখছে রূম্পাকে। তার চোখেমুখে কোনো ভয়ভীতি নেই। কিছু যেন খুঁজছে রুম্পার মধ্যে। খুঁজে কূলকিনারা পাচ্ছে না। রুম্পা শাড়ি ছেড়ে দিতেই পদ্মজা একটু পিছিয়ে গেল, দরজার ওপর পড়ল চোখ। দেখতে পেল: কেউ সরে গেল যেন। অদ্ভুত কারণে পদ্মজার বুক কাঁপতে থাকে। নুরজাহান নিজ ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন। আমির- পদ্মজাকে দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ! তিনি বাজখাঁই কণ্ঠে বললেন, ‘তালা খুলছে কেডায়? বাবু, নতুন বউরে নিয়া এইহানে আইছোস কেন?’


আমির দ্রুত রুম্পার কাছ থেকে সরে আসে। নুরজাহানকে কৈফিয়ত দেয়, ‘ভাবলাম, বাড়ির সবাইকে পদ্মজা দেখেছে। রুম্পা ভাবিকেও দেখুক। ভাবতে পারিনি ভাবি এমন কাজ করবে। ভাবি তো এখন আরো বেশি বিগড়ে গেছে, দাদু।’


‘তুই আমারে কইয়া আইবি না? তোর চিল্লানি হুইননা আমার কইলজাডা উইড়া গেছিল। বউ, তোমারে দুঃখ দিছে এই ছেড়ি?’


পদ্মজা দ্রুত বলল, ‘না, না। কিছু করেনি।’


আমির চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী বলছ? কিছু করেনি মানে? হাত দেখি?’


আমির পদ্মজার দুই হাত টেনে নিয়ে দেখে, বাঁ-হাতে নখের জখম।


আমির ব্যথিত স্বরে বলল, ‘ইস! কতটা আঘাত পেয়েছ। ঘরে চলো। দাদু এই নাও চাবি। তালা মেরে দিয়ো।’


আমির পদ্মজাকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বেরোবার আগ মুহূর্তে পদ্মজা রুম্পার দিকে তাকাল। দেখতে পেল, রুম্পা আড়চোখে তাকে দেখছে। সে চোখে স্নেহ, মমতা! একটু হাসিও লেগে ছিল। পদ্মজার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।


কী হচ্ছে এসব!


ঘরে এসে আমিরকে বলল, ‘উনার যত্ন কেউ নেয় না কেন?’


‘দেখোনি কী রকম করল? এই ভয়েই কেউ যায় না। শুরুতে তোমাকে দেখে যদি রেগে যেত তখনই তোমাকে নিয়ে চলে আসতাম। সবাইকে ভাবি তুই করে বলে। তোমাকে তুমি বলে সম্বোধন করতে দেখে ভেবেছি, বোধহয় তোমাকে পছন্দ হয়েছে। তাই আঘাত করবে না। কিন্তু সেই ধারণা ভুল হলো।


‘আপনি অকারণে চাপ নিচ্ছেন। নখের দাগ বসেছে শুধু।’


‘রক্ত চলে এসেছে।’


‘এইটুকু ব্যাপার না।’


আমির তুলা দিয়ে পদ্মজার হাতের রক্ত মুছে দিয়ে বলল, ‘আর ওইদিকে পা দিবে না।’


‘আম্মার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।’


‘লাবণ্যকে ঘুম থেকে তুলছে। ও ফজরে উঠতেই চায় না।’ আমির হেসে ফেলল।


‘আমি যাই।’


‘কোথায়?’


‘আম্মা সকাল সকাল রান্নাঘরে যেতে বলেছিলেন।’


‘তুমি রান্না করবে কেন?


‘অনুরোধ করছি এমন করবেন না। আমি আমার বাড়িতেও রান্না করেছি। টুকটাক কাজ করেছি। এখন না গেলে আম্মা রেগে যাবেন। রাগানো ঠিক হবে না।’


‘এসব ভালো লাগে না, পদ্মজা।’


‘আমি আসছি।’


আমিরকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পদ্মজা ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যায়। আমির শুধু চেয়ে থেকে দেখল।