নৈশভোজ শেষ হয়েছে মাত্র। পদ্মজা ও লাবণ্যকে পেয়ে পুলকিত পূর্ণা। আনন্দ বয়ে যাচ্ছে মনে। একটু পর পর উচ্চস্বরে হাসছে। হেমলতা একবার ভাবলেন, মেয়েকে এত জোরে হাসতে নিষেধ করবেন। পরমুহূর্তে কী ভেবে আর করলেন না। তিনি নিজেও বাড়ির বড়োদের সঙ্গে প্রফুল্লচিত্তে কথা বলছেন।


আমির সবার মনোযোগ পাওয়ার জন্য বলল, ‘আমার একটা কথা ছিল।’


সবাই আমিরের দিকে তাকাল। আমির নির্দ্বিধায় বলল, ‘ আমি আগামীকাল ফিরব।’


হেমলতা বললেন, ‘ঢাকায়?’


‘জি। পদ্মজাকে নিয়ে যাব। সঙ্গে লাবণ্যও যাবে। দুজনকে কলেজে ভর্তি করে দেব।’


পূর্ণার পাশ থেকে উঠে আমিরের পাশে দাঁড়াল লাবণ্য। আবদার করে বলল, ‘দাভাই, তুমি কইছিলা পাশ করলে আমারে দেশের বাইরে পড়তে পাঠাইবা।’


‘ছেড়ি মানুষ বাইরে যাইতি কেন? কইলজাডা বড়ো হইয়া গেছে?’ রেগে বললেন ফরিনা।


লাবণ্য মায়ের কথা অগ্রাহ্য করে আমিরকে বলল, ‘কথা রাখতে হইব তোমার।’


আমিরে একবার মজিদকে দেখল। এরপর লাবণ্যকে বলল, ‘সত্যি যেতে চাস?’


‘হ।’


লাবণ্যর মাথায় গাট্টা মারল ‘আমির। বলল, ‘আগে শুদ্ধ ভাষাটা শিখ। এরপর দেশের বাইরে পড়তে যাবি।’


লাবণ্য আহ্লাদিত হয়ে বলল, ‘পদ্মজা শিখায়া দিব। এইডা কোনো ব্যাপার না, দাভাই।’


‘আপাতত ঢাকা চল। শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে অভ্যস্ত হ। এরপর সত্যি পাঠাব।’


‘তুই পাগল হইয়া গেছস, বাবু? এই ছেড়িরে একা বাইরে পাড়াইয়া দিবি?’


‘জাফর ভাই আছে, ভাবি আছে। সমস্যা নেই, আম্মা। একটাই তো বোন। নিজের মতো পড়াশোনা করুক।’


ফরিনা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলেন। মেয়েমানুষ…এখন বিয়ে দেয়ার সময়, কিন্তু সবাই পড়াতে চাচ্ছে। এখন নাকি আবার বিলেতে পাঠাবে! মজিদ কথা বলছেন না। মানে তিনিও আমিরের দলে। তাহলে আর কথা বলে কী হবে? এই সংসারে এমনিতেও তার দাম নেই। নিজের মতোই বকবক করে যান, কেউই তার কথা শোনে না। ফরিনা রাগ করে বললেন, ‘তোদের যা ইচ্ছে কর।’ বলেই চলে যান।


হেমলতা বললেন, ‘কালই চলে যেতে হবে? দুই-তিন দিন পর হলে হবে না?’


আমির নম্র কণ্ঠে বলল, ‘না, আম্মা। আমি আট বছর হলো ঢাকা গিয়েছি। এর মধ্যে এই প্রথম তিন মাসের ওপর গ্রামে থেকেছি। ব্যাবসা ফেলে এসেছি। আমার অনুপস্থিতিতে আলমগীর ভাইয়া সামলাচ্ছে। এখন তো ভাইয়াও চলে এসেছে। আর আমার ব্যাবসা আমারই সামলানো উচিত। যত দ্রুত সম্ভব যেতে চাই। আপত্তি করবেন না।’


হেমলতা পদ্মজার দিকে চেয়ে বললেন, ‘তাহলে আগামীকালই যাচ্ছো?’


‘জি। আব্বা, আম্মাকে তো অনেক আগেই বলেছি। পদ্মজাও জানে। কিন্তু পদ্ম ভাবেনি সত্যি সত্যি যাব। দেখুন, কেমন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। কাল চলে যাব বলেই আজ আপনাকে নিয়ে এসেছি। আজ রাতটা মেয়ের সঙ্গে থাকুন। আবার কবে না কবে দেখা হয়!’


হেমলতা বেশ অনেকক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার কীসের ব্যাবসা আজও জানলাম না।’


মজিদ অবাক হয়ে বললেন, ‘আত্মীয় হলেন এতদিন এখনও জানেন না মেয়ের জামাই কীসের ব্যাবসা করে! বাবু, এটা তো বলা উচিত ছিল?’


‘আমি তো ভেবেছি জানেন হয়তো। তাই বলিনি। আম্মা, আমাদের এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের বিজনেস। মানে মালামাল বিভিন্ন দেশে আমদানি- রপ্তানি করে থাকি। এ কাজে আব্বা, রিদওয়ান, ভাইয়া, চাচা আছে। তাছাড়া, অনুন্নত দেশগুলো থেকে কম দামে পণ্য এনে উন্নত দেশগুলোতে বেশি মূল্যে বিক্রি করি। সব পণ্য গোডাউনে রাখা হয়। আমাদের অফিসও আছে। গোডাউন আর অফিসের সব কাজ আমাকে সামলাতে হয়। বলতে পারেন, আমারই সব ‘


‘অনেক বড়ো ব্যাপার।’ হাসলেন হেমলতা। তিনি জানতেন না আমির এতটা বিত্তশালী। এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট বিজনেস কম কথা নয়। এ সম্পর্কে মোটামুটি তিনি জানেন। কলেজ থাকাকালীন অনেক ব্যাবসা সম্পর্কেই জেনেছেন।


পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে পূর্ণা।


পদ্মজা বলল, ‘কথা বলছিস না কেন?’


‘কাল চলে যাবা, আপা?’


‘তাই তো কথা হচ্ছে।’


‘আমার খুব মনে পড়ে তোমাকে।’


‘কাঁদছিস কেন? আসব তো আমি।’


‘সে তো অনেক মাস পর পর।’ পূর্ণার গলা কাঁপছে


পদ্মজা কিছু বলতে পারল না। আমির ও মজিদের সঙ্গে কথা বলছেন হেমলতা। খলিল, আলমগীর নীরব দর্শক হয়ে বসে আছে। বিকেল থেকে রিদওয়ানের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। পদ্মজা হেমলতার উপর চোখ রেখে পূর্ণাকে প্রশ্ন করল, ‘আম্মা খুব শুকিয়েছে। খাওয়াদাওয়া করে না?’


‘না। মাঝে মাঝে সারাদিন পার হয়ে যায় তবুও খায় না।’


‘জোর করে খাওয়াতে পারিস না?’


‘জোর করলে ধমক দেয়। আমাদের কথা শুনে না।’


‘আম্মা ঘাড়ত্যাড়া।’


‘ঠিক বলেছ।’


‘পূর্ণা, উনি কেমন? আম্মার সঙ্গে ঝগড়া করে?


‘উনিটা কে?’


‘আব্বার প্রথম বউ।’


‘তুমি তো দেখতেও যাওনি।’


শ্বশুরবাড়ি থেকে চাইলেই যাওয়া যায় না। বল না, কেমন? আদর করে তোদের?’


‘ভালো খুব। সহজ-সরল। আম্মাকে খুব মানে। প্রেমা-প্রান্তকে অনেক আদর করে। দেখতেও খুব সুন্দর। আগে সাপুড়ের বউদের মতো সাজত। আমার পছন্দ না বলে এখন আর সাজে না।’


‘তুই নাকি খুব খারাপ ব্যবহার করিস?’


‘এখন করি না। তুমি কাকে দিয়ে এত খোঁজ রাখো?’


‘সে তোর জানতে হবে না। তাহলে উনি ভালো তাই তো?’


‘হুম।’


‘তাহলে মিলেমিশে থাকিস।’


‘ঢাকা যাওয়ার আগে দেখে যাও একবার।’


‘বাপের প্রথম বউকে আমার দেখার ইচ্ছে নেই।’ পদ্মজা থমথমে স্বরে বলল।


পূর্ণা বলল, ‘আচ্ছা। আমি আজ তোমার সঙ্গে ঘুমাব।’


‘হু, ঘুমাবি। আম্মার খেয়াল রাখবি। আম্মাকে দেখে মনে হচ্ছে, কোনো বিষয় নিয়ে খুব চিন্তা করে। তুই কথা বলবি, সময় দিবি। আম্মাকে একা ছাড়বি না।’


‘আমি তোমার মতো সব সামলাতে পারি না।’


‘চেষ্টা করবি। আব্বা আর প্রেমা-প্রান্তকে নিয়ে আসতে ভোরে মগা ভাইয়াকে পাঠাব। সবাইকে চোখের দেখা দেখে যাব।’


পূর্ণা পদ্মজাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কত দূরে চলে যাবে আপা! পদ্মজা অনুভব করে পূর্ণার ভেতরের আর্তনাদ। সে পূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘খুব দ্রুত আসব।’


পদ্মজা মাঝে শুয়েছে। তার দুই পাশে হেমলতা আর পূর্ণা। পূর্ণা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে তাকে। আর পদ্মজা শক্ত করে ধরে রেখেছে মায়ের এক হাত। হেমলতা নীরবতা ভেঙে পদ্মজাকে বললেন, ‘পদ্ম?’


‘হু, আম্মা?’


‘শহরে নিজেকে মানিয়ে নিবি। শক্ত হয়ে থাকবি। আর মনে রাখবি, কেউ কারোর না। সবাই একা। সবসময় নিজের ওপর বিশ্বাস রাখবি, নিজের ওপর আস্থা রাখবি। সৎ পথে থাকবি। কখনো কারো ওপর নির্ভরশীল হবি না। যদি তুই অন্য কারো ওপর নিজের ভালো থাকার দায়িত্ব দিয়ে দিস, কখনো ভালো থাকবি না। নিজের ভালো থাকার দায়িত্ব নিজেরই নিতে হয়। নিজেকে কখনো একা ভাববি না। যেখানেই থাকি আমি, আমার প্রতিটা কথা তোর সঙ্গে মিশে থাকবে। ছায়া হয়ে থাকবে। আল্লাহ সবাইকে কোনো না কোনো উদেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। সেই উদ্দেশ্য সফল হলে আর বেঁচে থাকার মানে থাকে না। মৃত্যুতে ঢলে পড়ে। আমার ইদানীং মনে হয়, আমার দায়িত্ব ছিল তোকে জন্ম দেয়া, বড়ো করে তুলে বিয়ে দেয়া। সেই দায়িত্ব কতটুকু রাখতে পেরেছি জানি না। কিন্তু তোর দায়িত্ব অনেক বড়ো কিছু!’


পদ্মজা চাপা স্বরে বলল, ‘কী সেটা?’


‘জানি না।’


‘তুমি এত কী ভাবো, আম্মা? মুখটা এরকম ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে কেন? খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করবে। আমি পরেরবার এসে যেন দেখি মোটা হয়েছো।’


হেমলতা হাসলেন। তার সাদা ধবধবে দাঁত ঝিলিক দেয়। তিনি পদ্মজাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘পরেরবার যখন আসবি একদম অন্য রকম দেখবি।’


‘কথা দিচ্ছো?’


‘দিচ্ছি।’


পদ্মজা হাসল। পূর্ণা বলল, ‘আমাকে জড়িয়ে ধরো, আপা।’


পদ্মজা পূর্ণাকে জড়িয়ে ধরে। হেমলতা দুই মেয়েকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘অনেক রাত হয়েছে, এবার চুপচাপ ঘুমা দুজন। আর কোনো কথা না।’


.


মাঝরাতে হেমলতার ঘুম ভেঙে গেল। তিনি চোখ খুলে কান খাড়া করে শুনতে পেলেন, দরজার বাইরে কেউ হাঁটছে। গা থেকে কাঁথা সরিয়ে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে সাবধানে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লেন। পায়ের শব্দটা যেদিক থেকে আসছে সেদিকে গিয়ে সাদা পাঞ্জাবি পরা একটা পুরুষ অবয়ব দেখতে পান।


তিনি তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকলেন, ‘রিদওয়ান?’


রিদওয়ান কেঁপে উঠে পেছনে ফিরল। বড়ো বড়ো হয়ে গেল তার চোখ দুটি। সে যে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে।


হেমলতা প্রশ্ন করলেন, ‘এত রাতে এখানে কী করছো?’


‘জ…জি হাঁটছিলাম।’


‘এত রাতে?’


‘প্রায়ই হাঁটি। অন্যদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন।’


হেমলতা রিদওয়ানকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে নিয়ে বললেন, ‘কোনোভাবে আমাকে খুন করতে এসেছো কী?’


রিদওয়ান থতমত খেয়ে গেল। বলল, ‘ন…না না! আপনাকে কেন খ…খুন করতে যাব? কী বলছেন!


‘প্রমাণ সরাতে।’ হেমলতার সহজ উক্তি।


রিদওয়ান হঠাৎই অন্যরকম স্বরে কথা বলল, ‘সে তো আমিও একজন প্রমাণ। স্বচক্ষে দেখা জ্বলজ্বলন্ত প্রমাণ। আপনি আমাকেও খুন করে প্রমাণ সরাতে পারেন। যেহেতু দুজনই একই পথের। কাউকে কারোর খুন করার প্রয়োজন নেই। আমি এখানে অন্য কাজে এসেছি।


হেমলতা কঠিন চোখে তাকালেন। পরপরই চোখ শীতল করে নিয়ে বললেন, ‘শুভ রাত্রি।’


রিদওয়ান হেসে হেলে-দুলে হেঁটে চলে গেল। হেমলতা ঘরে ঢোকার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেন। কিন্তু কদম ফেলার পূর্বেই পড়ে গেলেন শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে। ভাগ্যিস আওয়াজ হয়নি! তিনি হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেন। বাঁ-হাতের মাংস পেশি শক্ত হয়ে আছে। হাত নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে। ভর দিয়ে ওঠা আরো কষ্টদায়ক। তিনি ওভাবেই বসে থাকলেন অনেকক্ষণ।