রাতের আঁধার কেটে ভোরের আলোর মাধ্যমে শুরু হয়েছে আরেকটি নতুন দিন। পূর্ণা ও মগা মেঠোপথ ধরে হাওলাদার বাড়ি যাচ্ছে। মাথার ওপর আকাশ আলো করা তেজবিহীন সূর্য। পূর্ণার পায়ের গতি চঞ্চল। সে অস্থির হয়ে আছে। পাশেই কৃষকের ফসলি জমি ছেয়ে গেছে সবুজের সমারোহে। ফসলি জমির সবুজ আর ঘাস, গাছ-পালার ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দু সকালের প্রকৃতিতে এক অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। অথচ সেই সৌন্দর্য পূর্ণাকে ছুঁতে পারছে না। অন্যবেলা হলে সে শিশিরভেজা ঘাসে গা এলিয়ে দিত। কোনো এক অদ্ভুত কারণে ঠান্ডার মধ্যেও তার শিশিরে ভিজতে ভালো লাগে। এখন সেই মন-মানসিকতা নেই। মগা কিছুক্ষণ আগে তাকে খবর দিয়েছে: গতকাল রাতে পদ্মজা আহত অবস্থায় জঙ্গল থেকে ফিরেছে। প্রেমা ঘরে পড়ছিল। বাসন্তী রান্নাঘরে। তাই তারা শুনতে পায়নি। পূর্ণা রোদে বসে সকালের খাবার খাচ্ছিল। খবরটা শোনা মাত্র খাবার রেখে মগাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
কুয়াশা ঢাকা পথে উত্তরে হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে পূর্ণা হাওলাদার বাড়ি আসে। এক ছুটে পদ্মজার ঘরে যায়। পদ্মজা ঘুমে। শিয়রে ফরিনা বসে আছেন। পূর্ণা করুণস্বরে জানতে চাইল, ‘ও খালাম্মা, আপার কী হয়েছে?’
ফরিনা ইশারায় শান্ত হতে বলে, ধীরেসুস্থে রাতের ঘটনা খুলে বললেন। গতকাল এশার আজানের সময় পদ্মজা কোত্থেকে দৌড়ে সদর ঘরে এসে লুটিয়ে পড়ে। পা থেকে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছিল, কাঁটার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। শ্বাস নিচ্ছিল ঘন ঘন। গালের চামড়ারও একই অবস্থা। ফরিনা, লতিফা, আমিনা, রিনু পদ্মজাকে দেখে চমকে যায়। আমিনা দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাকি তিনজন পদ্মজাকে ধরে ঘরে নিয়ে আসে। পদ্মজা পানি খেতে চায়। পানি খাওয়ার পর বলে যে সে জঙ্গলে গিয়েছিল। জঙ্গলের কথা শুনে উপস্থিত দুজন কাজের মেয়ে ও ফরিনার মুখ পাংশুটে হয়ে যায়। তারা আর প্রশ্ন করেনি। বরং বুঝে গিয়েছিল কী হয়েছে! কাঁটা বের করতে গিয়ে আরো রক্তক্ষরণ হয়েছে। পদ্মজা যন্ত্রণায় ঠোঁট কামড়ে শুয়েছিল, অনবরত চোখের জল ফেলেছে। ব্যান্ডেজ করাটা জরুরি হয়ে যায়। কাটাছেঁড়ার প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে ফরিনার ধারণা নেই। তাই তিনি মজিদ হাওলাদারকে গিয়ে বলেন। এই বাড়িতে প্রায়ই মারামারি, কাটাকাটি চলে। তাই মজিদ হাওলাদারের কাছে ব্যান্ডেজ, স্যাভলনসহ বিভিন্ন জিনিসপাতি রয়েছে। তিনি প্রাথমিক চিকিৎসার জিনিসপাতি নিয়ে আসেন। তারপর পদ্মজার পা ভালো করে পরিষ্কার করিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেন।
বোনের পায়ের কাছে বসে হাহাকার করে বলল পূর্ণা, ‘আমার আপা এত কষ্ট পেয়েছে!’ পূর্ণার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে ফরিনার কাছে জানতে চায়, ‘ভাইয়া কোথায়?’
তাৎক্ষণিক ফরিনার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তিনি মিনমিনে গলায় বললেন, ‘জানি না।’
পূর্ণা অবাক স্বরে বলল, ‘ভাইয়া জানে না আপার কথা? রাতে দেখেনি?’
‘বাবু তো বাড়িত আহেই নাই। রানিরে যে খুঁজতে গেল আর আইছে না।’
‘রানি আপারে পাওয়া যায়নি?’
‘না।’
‘আচ্ছা।’
পদ্মজা শরীর নাড়াচ্ছে দেখে পূর্ণা কথা থামিয়ে দিল। সে পদ্মজার পেটের কাছে এসে বসল। বলল, ‘আপা।’
পদ্মজা পিটপিট করে চোখ খোলে। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো টুপ করে পদ্মজার ঝাঁপিয়ে পড়ল চোখেমুখে। দ্রুত চোখ বুজে ফেলল পদ্মজা। তারপর আবার ধীরে ধীরে চোখ খুলল। পূর্ণাকে দেখে অবাক হয়ে উঠে বসতে চাইলে অনুভব করল পায়ে অনেক ব্যথা। সে পায়ের দিকে চেয়ে আরও অবাক হলো। পায়ে ব্যান্ডেজ এলো কী করে! মনে করার চেষ্টা করল, কী হয়েছে তার সঙ্গে। আপন মনে নিজেকেই বলল, ‘রাতে এক ছুটে অন্দরমহলে চলে আসি। ভুলেও পেছনে ফিরে তাকাইনি। সদর ঘর থেকে আম্মা ঘরে নিয়ে আসেন। আব্বা ব্যান্ডেজ করে দেন। আম্মা খাইয়ে দেন। অনেক রাত হয়। উনি তখনো ফিরেননি। তাই চিন্তা হয়। আম্মাকে জিজ্ঞাসা করলে আম্মা বলছিলেন, চলে আসবে। তারপর কী হয়েছিল মনে নেই। ঘুমিয়ে পড়েছি বোধহয়!’
পদ্মজা ভাবনা থেকে বেরিয়ে সর্বপ্রথমে ফরিনাকে প্রশ্ন করল, ‘উনি ফিরেছেন?
‘না।’
পদ্মজা কী বলবে বুঝতে পারছে না। সে অনেক্ষণ পর বলল, ‘চাচা আর রিদওয়ান ভাই ফিরেছে?’
আইছে তো। তোমার চাচা এহন কই জানি না। রিদওয়ান হের ঘরেই আছে।
‘তাহলে আপনার ছেলে কোথায়?’ পদ্মজা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পূর্ণা পদ্মজার এক হাতে চেপে ধরে অনুরোধ করে, ‘আপা, শান্ত হও। খালাম্মা, রিদওয়ান ভাই আর ছোটো চাচা কিছু বলেনি ভাইয়ার ব্যাপারে? আপনি জিজ্ঞাসা করেননি?’
ফরিনা নির্বিকার স্বরে বললেন, ‘আমি হেরার লগে কথা কই না।’
‘আপনার ছেলের জন্য আপনার চিন্তা হচ্ছে না? রাতে বাড়ি ফেরেনি। আপনি তো মা নাকি?’ পদ্মজার গলা কাঁপছে। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে আমিরের কিছু হলে সে মাঝসমুদ্রে পড়বে। হেমলতার পর এই একটা মানুষকেই সে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে, ভালোবাসে। ফরিনা নিশ্চুপ। তিনি পদ্মজার কথায় পাত্তা দিচ্ছেন না।
ব্যথায় টনটন করে উঠল পদ্মজার পা। শীতের সময় কাটাছেঁড়া খুব যন্ত্রণার, যে যন্ত্রণায় পূর্ণা এখনও ভুগছে। সেদিন কাঁধে আঘাত পেল, আজও শুকায়নি ভালো করে। কিছুর ছোঁয়া লাগলেই ব্যথা করে। পূর্ণা পদ্মজাকে অনুরোধ করে বলল, ‘আপা, এমন করো না। ভাইয়া চলে আসবে। রানি আপাকে খুঁজতে গেছে। এজন্যই আসতে পারেনি।’
‘রানি আপার বাপ-ভাই তো চলে আসছে।’
‘তুমি তো জানোই, তারা কেমন। রানি আপার জন্য মায়া শুধু ভাইয়ার। তাই ভাইয়া রানি আপাকে ছাড়া আসতে পারছে না।’
পূর্ণার কথাগুলো যুক্তিসঙ্গত হলেও, পদ্মজার মন মানছে না। গোলমাল তো আছেই। পদ্মজা পূর্ণাকে এক হাতে সরিয়ে বিছানা থেকে নামার জন্য এক পা মেঝেতে রাখে। সঙ্গে সঙ্গে পুরো শরীরে একটা সূক্ষ্ম তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। আর্তনাদ করে আবার শুয়ে পড়ল পদ্মজা। ফরিনা ও পূর্ণা আঁতকে উঠে জোর করে শুইয়ে দিল পদ্মজাকে। কিন্তু পদ্মজা নাছোড়বান্দা, সে তার স্বামীর খবর যতক্ষণ না পাবে শান্ত হবে না। ফরিনা আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ওরা বাবুর ক্ষতি করব না। বাবুর কাছে ওদের অনেক কিছু পাওনের আছে। কাগজে-কলমে এই বাড়িডার মালিক বাবু।’
পদ্মজা তীর্যকভাবে তাকাল। বলল, ‘আপনি সব জানেন তাই না?’
পূর্ণা ফোড়ন কাটে, ‘কী জানবে?’
পূর্ণার উত্তর না দিয়ে পদ্মজা ফরিনাকে প্রশ্ন করল, ‘বলুন, আম্মা।’
ফরিনা আড়চোখে দরজার দিকে তাকালেন। ফরিনার দৃষ্টি অনুসরণ করে পদ্মজা-পূর্ণাও তাকাল। কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। শাড়ি দেখে মনে হচ্ছে লতিফা। পূর্ণা ডাকতে উদ্যত হয়। পদ্মজা পূর্ণার হাত ধরে ফেলে। ইশারা করে চুপ থাকতে। তারপর ফরিনাকে প্রশ্ন করে, ‘তাহলে আপনি নিশ্চিত ওরা উনার ক্ষতি করবে না?’
‘জানে মারব না।’
এ কথা শুনে পদ্মজা হকচকিয়ে যায়। সে উৎকর্ণ হয়ে বলল, ‘এ কথা কেন বলছেন?’
ফরিনা আবার নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। পদ্মজার মাথার রগ রাগে দপদপ করছে। এই বাড়ির মানুষগুলোর মস্তিষ্কের কী চলে তার কোনো কিনারা নেই! এত জটিল! কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না। একেকবার একেকজনের একেক রূপ।
.
পদ্মজাকে সারাদিন এটা-ওটা বলে বিছানায় রাখা হলো। ফরিনাও সারাদিন পাশে রইলেন। পদ্মজা সারাক্ষণ উনি, উনি করে গেছে। ফরিনা কোনো জবাবই দিলেন না। দরজার ওপাশেও সারাক্ষণ লতিফা ছিল। পূর্ণা অনেকবার লতিফাকে ধরেছে। তখন লতিফা হেসে বলেছে, ‘পদ্ম আপা কেমন আছে, দেখতে আইছিলাম।’ পূর্ণা কঠিনস্বরে অনেকবার নিষেধ করেছে যাতে আর না আসে। তবুও লতিফা এসেছে। পদ্মজা নিষেধ করার পর, পূর্ণা স্থির হয়। বিকেল হয়ে গেল, তবুও আমিরের দেখা নেই। এদিকে পদ্মজা বিছানায় বসে ইশারায় ফজরের কাজা নামাজ পড়েছে। দুপুরের, আছরের নামাজও বসে বসে ইশারায় করেছে। ফরিনা দুপুরে না করেছিলেন, ‘এত কষ্ট কইরা নামাজের কী দরহার! কইরো না। আল্লাহ মাফ করব এমনিতে।’
পদ্মজা তখন মিষ্টি করে হেসে জবাব দিয়েছিল, যতক্ষণ হুঁশজ্ঞান আছে নামাজ ছাড়ার পথ নেই, আম্মা। আল্লাহ তায়ালা অসুস্থ মানুষকে ইশারায় নামাজ পড়ারও পথ দিয়েছেন। কেন দিয়েছেন? নামাজ বাধ্যতামূলক বলে। ইসলামে নামাজের গুরুত্ব অনেক বেশি।’
ফরিনা এই কথার ওপরে কিছু বলতে পারেননি। পদ্মজা ধর্মকর্ম নিয়ে খুব জানে। পদ্মজার কাছ থেকে তিনি অনেক কিছু শিখেছেন। ধর্মের কথা বলার সময় পদ্মজা অন্য সবকিছু ভুলে যায়। তাই পুরোটা দুপুর তিনি পদ্মজাকে ইসলাম ধর্মের খুঁটিনাটি নিয়ে প্রশ্ন করেই গেছেন। বিকেলবেলা পূর্ণা জানাল, সে আজ এই বাড়িতে থাকবে। পদ্মজা এ কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সে জোরাজুরি করে পূর্ণাকে মোড়ল বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এই বাড়ি মোটেও সুবিধার না। সে ঝুঁকি নিতে চায় না। পূর্ণা চলে যাওয়ার আগে পদ্মজা কিছু সুরার নাম বলে দেয়। পড়ে ঘুমানোর জন্য একটা দুই লাইনের সুরা শিখিয়ে দেয়। পড়ে ঘুমালে বিপদ হবে না।
পূর্ণা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আজান পড়ে সন্ধ্যার। পূর্বের নিয়মেই নামাজ পড়ে পদ্মজা। ফরিনা পদ্মজার ঘর ছেড়ে রান্নাঘরে চলে যান। পদ্মজা নামাজ শেষ করে বালিশে হেলান দিয়ে চোখ বুজে। আমিরের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। দুইদিন কেটে যাচ্ছে আমিরের দেখা নেই। তার মনের অবস্থা করুণ। বার বার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। প্রহর গুণছে এই বুঝি মানুষটা চলে এলো। পদ্মবতী, পদ্মবতী বলে একাকার করে দিল ঘর। কিন্তু আসে না।
পদ্মজার বুকের বাঁপাশে চিনচিন ব্যথা বেড়েই চলেছে। গতকাল রাতে আক্রমণ করা লোকটিকে সে তখন চিনতে পারেনি। কিন্তু এখন আন্দাজ করতে পারছে তার পরিচয়। তবে আমিরের শূন্যতা তাকে পোড়াচ্ছে খুব। সে এমন ছটফটানি নিয়ে আর থাকতে পারছে না। আহত পা মাটিতে রেখে ভর দিতেই আবার সেই তীব্র ব্যথা। কিন্তু এর চেয়েও গভীর ব্যথা আমিরের দেখা না পাওয়া। পদ্মজার দুই পায়ের পাতার এক পাশ অক্ষত। সে ওই এক পাশ দ্বারা মাটিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এক তলায় যায়। সোজা চলে আসে রিদওয়ানের ঘরে। দরজা একটু খোলা ছিল। পদ্মজা একবার ভাবল কড়া নেড়ে ঘরে ঢুকবে। কী মনে করে আর নাড়ল না, সোজা দরজায় ধাক্কা মারল। রিদওয়ান চমকে ঘুরে তাকাল। পদ্মজাকে দেখে তাড়াতাড়ি শার্ট পরতে উদ্যত হয়। পদ্মজা মুচকি হেসে বলল, শার্ট পরে লাভ নেই। চোখে পড়ে গেছে।’
রিদওয়ান ফিরে দাঁড়াল। লম্বা করে হেসে শার্ট পরল। বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল, ‘বুদ্ধিমতী। তো দেখতে এসেছো কেমন আছি? ভালো নেই। ছুরি এবং চুরির মালিক দুজনেরই তেজ বেশি ছিল।’
পদ্মজা তিরষ্কার করে হাসল। দুই কদম এগিয়ে এসে বলল, ‘পাগলের প্রলাপ! আন্দাজ ঠিক হবে ভাবিনি। এবার বলুন উনি কোথায়?’
রিদওয়ান ভ্রু দুটি বাঁকিয়ে বলল, ‘আমির?’
পদ্মজা জবাব দিল না। রিদওয়ান বলল, ‘আমি জানব কী করে তোমার জামাই কোথায়?’
‘জানেন না?’ পদ্মজার কড়া প্রশ্ন।
রিদওয়ান উত্তরে হাসল। একটা ছুরি বের করল সে আলমারি থেকে, শীতল স্বরে প্রশ্ন করল, ‘তোমার ছুরিটার নাম কী? আমির কোন দেশ থেকে এনে দিয়েছে?
ফুটপাত থেকে কেনা। ছুরির ধার থাকলেই চলে। অভিজ্ঞ হতে হয় আক্রমণকারীর হাত। তাই ছুরির নাম না খুঁজে নিজের হাতটাকে অভিজ্ঞ করুন।’ পদ্মজার সূক্ষ্ম অপমান বুঝতে রিদওয়ানের অসুবিধা হলো না। সে আলমারির কপাট লাগিয়ে এগিয়ে এসে বলল, ‘ব্যঙ্গ করছ?’
পদ্মজা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল রিদওয়ানের দিকে। বলল, ‘কী আছে জঙ্গলে? কী আড়াল করছেন?’
‘তা জেনে তুমি কী করবে?’
‘কোন অপরাধ চলছে?’
‘তোমাকে জানতে হবে না।’
তখনো তো মারতে এসেছিলেন। এখন তো কাছে আছি, আক্ৰমণ করছেন না কেন?’
রিদওয়ান হাসল। পদ্মজার পেছনে গিয়ে ঘাড়ে ফুঁ দিল। সঙ্গে সঙ্গে পদ্মজা দূরে সরে যায়। হুমকি দিয়ে বলল, ‘নোংরামি করার সাহস করবেন না। তখনের আঘাতগুলো ভুলে যাবেন না। আমি আমাকে রক্ষা করতে জানি।’
‘এজন্যই পালিয়ে এসেছিলে?’
‘পদ্মজা ক্ষণকালের জন্য পালিয়েছে। যা-ই থাকুক, আমি খুঁজে বের করবই। আর ধ্বংসও করব এই আমি।’
‘দেখো, পদ্মজা, তুমি আর এসব ঘেঁটো না। সুখে আছো সুখে থাকো। নয়তো পরিণতি খারাপ হবে। ভালো করে বলছি ঢাকা ফিরে যাও। আর এসো না।’
‘ভয় পাচ্ছেন?’
‘কাকে? তোমাকে?’ রিদওয়ান সশব্দে হাসল। রিদওয়ানের হাসি পদ্মজার গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে। রিদওয়ান হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমাকে ভয় পাবে রিদওয়ান?’
‘উনি কোথায় সত্যি জানেন না?’
‘না, জানি না।’
‘আমি কিন্তু—’
‘কী করবে? খুন করবে?’ রিদওয়ান কিড়মিড় করে এগিয়ে আসে। পেছন থেকে পদ্মজার দুই হাত মুচড়ে ধরে বলল, ‘ভালো করে বলছি আর গভীরে যেয়ো না। এককালে তোমাকে বিয়ে করার কথা ভেবেছিলাম বলে বলছি, আর গভীরে যেয়ো না। তোমার করুণ দশা আমিও আটকাতে পারব না।’
‘ছাড়ুন আমাকে।’
‘ছাড়ব না।’ রিদওয়ান পদ্মজার কাঁধে ঠোঁট ছোঁয়াতেই পদ্মজার সারা শরীর রি রি করে ওঠে। মাথা দিয়ে পেছনে থাকা রিদওয়ানের মুখে আঘাত করে সে।
রিদওয়ান কিছুটা পিছিয়ে গেল, নাকে ভীষণ ব্যথা পেয়েছে। সে কিড়মিড় করে তাকাল হিংস্র জন্তুর মতো। বলিষ্ট, মোটাসোটা শরীরটাকে হারানো যেকোনো মেয়ের জন্য অসাধ্য। পদ্মজা নিজেকে রক্ষা করার জন্য টেবিল থেকে জগ নিলো হাতে। রিদওয়ান বলল, ‘তুমি বাড়াবাড়ি করছো, পদ্মজা।’
‘উনি যদি জানতে পারেন যে আপনি আমার সঙ্গে এই অসভ্যতা করেছেন, আপনার দেহে প্রাণ থাকবে না।’
রিদওয়ান ফিক করে হেসে দিল, যেন মাত্রই মজার কোনো কথা বলল পদ্মজা। রিদওয়ান হাসি ঠোঁটে রেখে বলল, ‘আগে তো ও নিজেকে বাঁচাক। তারপর আমাকে প্রাণে মারবে নাহয়।’
রিদওয়ানের এই কথাটি যেন বজ্রপাত ঘটাল। চিৎকার করে জানতে চাইল পদ্মজা, ‘কোথায় রেখেছেন উনাকে? কী করেছেন উনার সঙ্গে?’
‘ঘরে যাও, পদ্মজা।’
‘আপনি বলুন, উনি কোথায়?’
‘যাও ঘরে।’
‘বলুন আপনি।’
‘পদ্মজা!’
পদ্মজা জগ ছুঁড়ে মারল রিদওয়ানের দিকে। ঝট করে সরে দাঁড়াল রিদওয়ান। জগ স্টিলের থালাবাসনের ওপর পড়ে বিকট শব্দ হলো। সেই শব্দ শুনে ছুটে আসে ছুটে মজিদ, খলিল।
তবে আসেনি একজন মহিলাও।
পদ্মজা বিছানার ওপর ছুরি দেখে দ্রুত হাতে তুলে নিলো সেটা। সে তার নিজস্ব কৌশল ব্যবহার করে রিদওয়ানকে আঘাত করতে উদ্যত হলো। রিদওয়ান ছুরিসহ পদ্মজার হাত ধরে ফেলে। ফিসফিসিয়ে বলল, ‘তোমার তিন বছরের ছুরি চালানোর অভিজ্ঞতা আর আমার বিশ বছরের পেশা। পেরে উঠবে না।’
পদ্মজার হাত থেকে খলিল ছুরি টেনে নিলো। পদ্মজা যেন হিংস্র বাঘিনী হয়ে উঠেছে। আমিরের শোকে তার মাথা কাজ করছে না। দুই দিন হয়ে গেল আমিরের দেখা নেই। তার ওপর সারা শরীরে ব্যথা। তার নিজেকে উন্মাদ মনে হচ্ছে। রাগে রিদওয়ানের গলা চেপে ধরল সে। রিদওয়ান পদ্মজার হাত থেকে ছোটার চেষ্টা করতে গিয়ে পদ্মজাকে নানাভাবে আঘাত করল বটে, তবে পদ্মজা কিছুতেই ছাড়ছে না। তার শরীরের শক্তি হঠাৎই দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। আমির তার জীবনে কতটা মূল্যবান—তা কেউ জানে না। আমিরের জন্য সে সবকিছু করতে পারে। খলিল এক হাতে পদ্মজার চুল মুঠ করে ধরে, অন্য হাতে পদ্মজার গাল চেপে ধরে বলল, ‘বেশ্যার ছেড়ি, আমার ছেড়ারে ছাড়।’
তাও পদ্মজা ছাড়ল না। মজিদ এগিয়ে এসে পদ্মজাকে টেনে সরালেন। পদ্মজার শরীর কাঁপছে। সে চিৎকার করে বলছে, ‘উনার কিছু হলে আমি কাউকে ছাড়ব না। মেরে ফেলব। মেরে ফেলব একদম।’
রিদওয়ান ছাড়া পেয়ে প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো। তারপরই তেড়ে এসে থাপ্পড় বসাল পদ্মজার গালে। পদ্মজার গালের ক্ষত থাপ্পড়ের ভার নিতে ব্যর্থ হয়, ছিলে গেল চামড়া। পদ্মজার দুই হাত মজিদ ধরে রেখেছেন। পদ্মজা আম্মা মজিদকে খেয়াল করেনি। সে চেঁচিয়ে ফরিনাকে ডাকল, আম্মা, আপনি কোথায়? আম্মা ওরা আপনার ছেলেকে মেরে ফেলবে। আম্মা…’
ফরিনা এলেন না। খলিল হুংকার ছাড়েন, ‘এই খানকির ছেড়ির গত্রে আগুন বেশি। ছিঁইড়া দে ওরে।’
পদ্মজার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। সে মুখভরতি থুতু ছুঁড়ে দেয় খলিলের মুখের ওপর। তাৎক্ষণিক রিদওয়ান পদ্মজার শাড়ির আঁচল দিয়ে পদ্মজারই গলা পেঁচিয়ে ধরে কিড়মিড় করে বলল, ‘এই মাঘীর ঝি, তোরে অনেক্ষণ ধরে বোঝাচ্ছিলাম। ভালো কথা কান দিয়ে ঢুকে না? মায়ের মতো হইছস? তোর মারেও মেরে দিতাম, যদি নিজে থেকে না মরত।’
পদ্মজার চোখ উলটে যাচ্ছে। মজিদ রিদওয়ানকে বললেন, ‘রিদওয়ান ওরে ছেড়ে দে। মরে যাবে!’
রিদওয়ান তাও ছাড়ছে না। অবশেষে খলিল রিদওয়ানকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরালেন। পদ্মাজার শরীরের সব শক্তি শেষ। সে কাশতে কাশতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, চোখ বুজে আসছে। কল্পনায় ভেসে উঠল আমিরের শ্যামবর্ণের মায়াময় মুখ। আর মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে ডাকল, ‘আম্মা।’
তারপরই হারিয়ে ফেলল জ্ঞান। তিনজন পুরুষের মাঝে লুটিয়ে পড়ে আছে পদ্মজা। বুকে শাড়ি নেই। খয়েরি রঙের ব্লাউজ পরা। গলায় লাল দাগ। মুখে নখের আঁচড়। গালে চেপে ধরার দাগ। চামড়া ছিলে যাওয়ার রক্ত। ফরসা দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরার দাগ জ্বলজ্বল করে ভাসছে। চুল কয়টা ছিঁড়ে পড়ে আছে আশপাশে। পায়ের সাদা ব্যান্ডেজ আবার লাল হয়ে উঠেছে। আগুন সুন্দরী পদ্মজার খুঁতহীন রূপে খুঁতের মেলা বসে গেছে! জানালা দিয়ে আসা উত্তরে হাওয়ায় হুঁশহারা পদ্মজার রক্ত ধীরে ধীরে শুকাতে থাকে। কেউ নেই তাকে বুকে আগলে ধরার জন্য।
পদ্মজার অবস্থা দেখে ঘরের দেয়ালগুলোও গুমরে গুমরে কাঁদছে।
