মাথার ওপর সূর্য নিয়ে কলসি কাঁখে আজিদের বাড়িতে ঢুকল পূর্ণা। পাতলা ছিপছিপে গড়ন অথচ কাঁখে পিতলের প্রকাণ্ড কলসি! খালি কলসির ভারেই বাঁকা হয়ে পড়েছে! পানিভরতি কলসি নিয়ে কী করে বাড়ি ফিরবে কে জানে! সকাল থেকে তাদের টিওবওয়েলে সমস্যা। পানি আসছে না। সকালে বাসন্তী আজিদের বাড়ি থেকে পানি নিয়েছেন। এখন আবার আসতে চেয়েছিলেন, পূর্ণা আসতে দিল না। সে নিজে দায়িত্ব নিয়ে এসেছে। বাসন্তী অনেকবার বলেছেন, ‘এইটুকু শরীর নিয়ে পারবি না।’


পূর্ণা অহংকার করে বলেছে, ‘আমি পারি না এমন কিছু নেই। তুমি ঘরে যাও তো।’


আজিদের বাড়ির সামনে পুকুর আছে। সেখানে নতুন ঘাট বাঁধানো হয়েছে। ঘাটে গোসল করছে আজিদের বউ আসমানি। ছয় মাস আগে বিয়ে হলো। আসমানির সঙ্গে পূর্ণার অনেক কথা হয়েছে।


পূর্ণা আসমানিকে না দেখলেও আসমানি পূর্ণাকে দেখে ডাকল, ‘কি গো পূর্ণা! ফেইরাও চাইলা না। ভাবিরে চোক্ষে পড়ে নাই?’


পূর্ণা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। অপরাধী কণ্ঠে বলল, ‘খেয়াল করিনি, ভাবি।’


‘পানি নিতে আইছো?’


‘হু, আমাদের টিউবওয়েল—’


‘শুনছি খালাম্মার কাছে। একটু বইসো। আমি ডুব দিয়া আইতাছি।’


‘আচ্ছা, ভাবি।’


পূর্ণা মুখে আচ্ছা বললেও মনে মনে পরিকল্পনা করে পানি নিয়ে অন্য পথ দিয়ে বাড়িতে চলে যাবে। আসমানি একবার কথার ঝুড়ি নিয়ে বসলে, কথা ফুরোয় না। পূর্ণা আড্ডাবাজি খুব পছন্দ করে। কিন্তু এখন তার তাড়া আছে। তাড়াতাড়ি ফেরা চাই। দুপুর হয়ে গেছে। পদ্মজাকে এখনও দেখতে যেতে পারেনি সে। গতকাল বিকেলে যে দেখে এলো, তারপর আর খোঁজ মিলেনি। চিন্তায় সারারাত ঘুম হয়নি পূর্ণার। আজিদের বাড়ির অঙ্গণ শূন্য, ঘরের বাইরে কেউ নেই। পূর্ণা সোজা কলপাড়ে এসে দ্রুত কল চেপে কলসি ভরে নিলো। কিন্তু কলসি কাঁখে তুলতে গিয়ে হলো সমস্যা, কিছুতেই তুলতে পারছে না। আসমানি গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো। ফরসা, সুন্দর একটা মুখ। নতুন বউ-নতুন বউ ছাপটা এখনও মুখে লেগে আছে। আসমানি কাছে এসে হেসে বলল, ‘এত বড়ো কলসি নিবা কেমনে? খালাম্মারে পাঠাইতা।’


‘তুমি একটু সাহায্য করো।’


‘কী কও? আমি লইয়া যামু কলসি?’


‘আমি কি তা বলছি, ভাবি! কাঁখে তুলতে সাহায্য করো।’


আসমানি ঠোঁটে হাসি নিয়ে বলল, ‘ওহ! বাড়ির বউ তো শরম লজ্জার ডরেই বাইর হই না। নয়তো বাড়ি অবধি দিয়া আইতাম।’


‘বাড়ি থেকে বের হতেই লজ্জা, ভাসুরের সঙ্গে শুতে লজ্জা নাই?’


পূর্ণা কটাক্ষ করে বলল, ঠোঁটে তিরস্কারেরা হাসি। আসমানির চোখমুখের রং পালটে গেল, লাল হয়ে গেল ফরসা মুখটা। চোখ ছাপিয়ে নেমে এলো জল। ক্ষণমুহূর্ত পূর্ণার দিকে চেয়ে থাকে সে। তারপর এদিক- ওদিক দেখে পূর্ণার এক হাত চেপে ধরে চাপা স্বরে বলল, ‘কী কইরা জানছো?’


পূর্ণা এক ঝটকায় আসমানির হাত সরিয়ে দিল। বলল, ‘তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসে জানালা দিয়ে এই নোংরামি দেখছি। আজিদ ভাই মাটির মানুষ। কত ভালো উনি। উনাকে কেন ঠকাচ্ছো, ভাবি?’


আসমানি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার হাত দুটি অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। চোখ থেকে জলের ধারা নেমেছে। পূর্ণার দেখে মায়া হয়। সে কণ্ঠ নরম করে বলল, ‘কাউকে বলিনি আমি। বারো-তেরো দিন যখন চেপে রাখতে পেরেছি, সারাজীবন পারব। ভালো হয়ে যাও, ভাবি। আজিদ ভাইকে ঠকিও না। পাপ করো না।’


আসমানি অশ্রুরুদ্ধকর কণ্ঠে বলল, ‘আমারে খারাপ ভাইবো না।’


পূর্ণা কিছু বলল না। খারাপ কাজ করার পরও কী করে খারাপ না ভেবে থাকা যায়! সে আসমানিকে অগ্রাহ্য করে কলসি তোলার চেষ্টা চালাল। আসমানি দ্রুত পায়ে কলপাড় ছাড়ে। পূর্ণা কলসি কাঁখে তুলতে সক্ষম হলো, কিন্তু খুব বেশি ভার। এখনই কোমর মচকে যাবে! পূর্ণা কলপাড় ছাড়তেই সামনে এসে দাঁড়াল আসমানি। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে এক নিশ্বাসে বলল, ‘কাউরে কইয়ো না, পূর্ণা। আমারে তোমার ভাই আর ঘরে রাখব না। আমি চাই নাই এমন করতে। শফিক ভাই তো আমগোর থানার পুলিশ মানুষ। আমার ছোডু বইনডা এক মাস ধইরা হারায়া গেছে। অনেক খুঁজছি পাই নাই। পুলিশ দিয়া খোঁজানোর ক্ষেমতা আমার বাপের নাই। শফিক ভাইরে কইছিলাম, তহন উনি কইছে উনার সঙ্গে—’  


আসমানি ফোঁপাতে থাকে। চোখ থেকে বৃষ্টির মতো জল পড়ছে, সমুদ্র বয়ে যাবে এক্ষুনি। পূর্ণা খুব অবাক হয়। একটা মানুষ কতটা নিকৃষ্ট হলে এভাবে ছোটো ভাইয়ের বউয়ের বিপদে সাহায্য করার নামে এমন কুৎসিত শর্ত রাখতে পারে? পূর্ণার রাগ হয় খুব। আসমানিকে আশ্বাস দিয়ে পূর্ণা বলল, ‘ভাবি, কেঁদো না। যে মানুষ এমন শর্ত দিতে পারে সে কখনোই কাউকে সাহায্য করতে পারে না। উনি তোমার বোনকে খুঁজবে না। কিন্তু আশা দেখিয়ে ভোগ ঠিকই করবে। আর সুযোগ দিয়ো না। দোয়া করো শুধু তোমার বোন যেন ফিরে আসে।’


আসমানি শাড়ির আঁচল দিয়ে দুই চোখ মুছে বলল, ‘জানো পূর্ণা, আমি আমার বইনরে ছাড়া একটা দিনও থাকতে পারতাম না।’


‘তোমার সঙ্গে তো এক মাসে আরো দুইবার দেখা হয়েছে। কখনো তো বললে না তোমার বোনকে পাওয়া যাচ্ছে না।’


‘আম্মা কইছে, ছেড়ি মানুষ হারায়া গেলেও কেউরে কইতে নাই। মানুষ ভাববো ছেড়া নিয়ে পলাইছে।’


‘আমি আসি আজ। কাল এসে সব শুনব। অনেক কথা বলব।’


আসমানি ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল। পূর্ণা ধীর পায়ে আজিদের বাড়ির উঠোন ছাড়ে। পথে উঠতেই দেখা হয় আজিদের মার সঙ্গে। নাম মালেহা বানু। সঙ্গে পাশের বাড়ির বৃদ্ধা জয়তুনি বেগম রয়েছেন। বৃদ্ধার মাজা বয়সের ভারে ঈষৎ ভেঙে শরীর সামনে ঝুঁকে পড়েছে। পূর্ণাকে দেখে মালেহা বললেন, ‘কি রে ছেড়ি, পানি নিতে আইছিলি?’


‘জি, খালা।’


‘কলসির ভারে দেহি সাপের লাহান বাঁইকা গেছস লো!’ বললেন জয়তুনি বেগম।


পূর্ণার সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে। সে কলসি নামাল। প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিলো একটা। মালেহা বললেন, ‘বিয়েশাদি কী করবি না? তোর বইনে না আইছে বিয়া দিব?’


‘দিবে মনে হয়।’


‘তোর লগে হাওলাদার বাড়ির কোন ছেড়ার নাকি ঢলাঢলি চলে?’ বললেন জয়তুনি বেগম। কথা বলার ভঙ্গিটা দৃষ্টিকটু ছিল। পূর্ণার গা জ্বলে উঠে। রেগে যায়। বলল, ‘আপনাকে কে বলেছে?


‘এইসব কিচ্ছা বাতাসে ছড়ে। এমন আর করিছ না, পূর্ণা। গায়ের রঙডা ময়লা, বয়সও বেশি; আবার তো আরেক কিচ্ছাও আছে। কয়েক বছর আগে বেইজ্জতি হইছিলি গ্রামবাসীর হাতে। এহন আবার এমন কিচ্ছা কইরা বেড়াইলে কেউ বিয়া করব না। এহন দেখ তোর বইনে কোনো ল্যাংড়া, লুলা দেইখা বিয়া দিতে পারেনি।’ বললেন মালেহা।


পূর্ণার মাথার আগে মুখ চলে বেশি। সে কিছু কড়া কথা শোনাতে উদ্যত হয়। তার পূর্বেই একটা প্রিয় পুরুষ কণ্ঠ ধেয়ে আসে, ‘পূর্ণারে কে বিয়া করব না করব সেটা তো আপনেরে দেখতে কয় নাই কেউ।’


পূর্ণা না তাকিয়েই চিনে যায় কণ্ঠটির মালিককে। বুকের বাঁ পাঁজর ছ্যাঁত করে উঠল। উপস্থিত তিনজন একসঙ্গে ঘুরে তাকাল। কিছুটা দূরে মৃদুল দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় গামছা বাঁধা। পরনে কালো শার্ট আর নীল লুঙি। রোদের আলোয় গায়ের ফরসা রঙ চিকচিক করছে। কী সুন্দর! পূর্ণা হেসে আবার চোখ ঘুরিয়ে নিলো। মৃদুল মালেহাকে উদ্দেশ্য করে আবার বলল, নিজের চরকায় তেল দেন। পূর্ণার গায়ের রঙ ময়লা আর আপনের কি পরিষ্কার? নিজের রঙডা আগে দেখেন।’


‘এই ছেড়া তুমি কই থাইকা আইছো? বাপের নাম কিতা?’ বললেন মালেহা।


‘কেন? পছন্দ হইছে? ছেড়ি আছে? বিয়া দিবেন? ছেড়ির গায়ের রং পরিষ্কার তো?


মালেহা বানু হকচকিয়ে গেলেন। এ কেমন জাতের ছেলে! কেমন ফটফট করে! মৃদুল যেন বিরাট রসিকতা করেছে এমনভাবে হাসল পূর্ণা। মৃদুল কলসি কাঁধে তুলে নিয়ে পূর্ণাকে আদেশের স্বরে বলল, ‘হাসি থামায়া হাঁটো।’


মালেহা বানু ও জয়তুনি বেগমকে অবাক করে মৃদুল, পূর্ণা চলে যায়। কিছুটা দূর এসে পূর্ণা প্রথম মুখ খুলল, ‘কখন এসেছেন?’


‘কিছুক্ষণ আগে। মুখটা শুকনা দেখাইতাছে কেন? ‘আপাকে দেখেছেন আপনি?’


‘না। অন্দরমহলে ঢুকি নাই।’


পূর্ণা চুপ হয়ে যায়। মৃদুল বলল, ‘এত ভার কলসি নিতে পারছো?’


‘কষ্ট হয়েছে।’


‘তো নিতে গেলা কেন?’


পূর্ণা আবার চুপ হয়ে গেল। মৃদুল দাঁড়িয়ে পড়ে। আর এক মিনিট হাঁটলেই মোড়ল বাড়ি। সে পূর্ণার মুখের দিকে চোখ রেখে বলল, ‘খুশি হও নাই?’


‘কী জন্য?’ পূর্ণা অবাক হয়ে জানতে চাইল।


‘এই যে আইয়া পড়ছি।’


পূর্ণা চোখ নামিয়ে ফেলে। মুচকি হাসে। চোখেমুখে লজ্জা ফুটে উঠে। মৃদুলও হাসল। সে যা বোঝার বুঝে গেছে। আশপাশে অনেক গাছপালা। বড়ো একটা গাছের ছায়ায় তারা দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামের কেউ দেখে ফেলবে এই ভয় দুজনের কারোর মধ্যে নেই। পূর্ণার পরনের কাপড়খানি ভেজা। কলসি থেকে পানি পড়ে ভিজে গেছে। পেট ও কোমরের একাংশে লেপ্টে আছে কাপড়। মাথায় ঘোমটা নেই। গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে এক ঝলক রোদ পূর্ণার মুখ ঘেঁসে কাঁধ ছুঁয়ে মাটিতে পড়ে। সবকিছু মৃদুলের নজরে বন্দি! সে চমৎকার করে পূর্ণাকে বলল, ‘ঘোমটা দিয়ে পথে হাঁটবা। বুঝছো, ডাগরিনী?’


পূর্ণা ঠোঁটে হাসি রেখেই বাধ্যের মতো হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়াল। তারপর চট করে টেনে নিলো ঘোমটা। মৃদুলের মুখের ডাগরিনী শব্দটা তার মন কাঁপিয়ে তুলেছে। খুশিতে উড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। ডাগরিনী বলেছে মানে, তার চোখ দুটি ডাগর ডাগর…যা মৃদুলের ভালো লেগেছে! তার প্রশংসা করেছে!


দুপুরের খাওয়াদাওয়া করে পূর্ণা তৈরি হয় হাওলাদার বাড়ি যাওয়ার জন্য। সঙ্গে তৈরি হয় বাসন্তী, প্রেমা ও প্রান্ত। তখন মগা এলো। পূর্ণার হাতে চিঠি দিয়ে বলল, ‘তোমার বইনে দিছে।’


চিঠি হাতে নিয়ে পূর্ণা মনে মনে ভয় পেল। আপা চিঠি কেন পাঠাবে? অজানা আশঙ্কায় পূর্ণার বুক ধুকপুক করতে থাকে। মগা চলে যায়। চিঠি খুলল পূৰ্ণা—


আদরের বোন,


তুই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসিস, আমি জানি। আমার সব কথাও মানিস। মাঝে মাঝে ফাঁকিবাজিও করিস তবে এখন আমি তোকে যা করতে বলব একদম অমান্য করবি না। এটা আমার অনুরোধ।


যতদিন না আমি আসছি বা চিঠি লিখছি, একদম এই বাড়িতে আসবি না। কেউ যদি বলে আমি পাঠিয়েছি তোকে আনতে। তাও আসবি না। চোখ-কান খোলা রাখবি। প্রেমাকে দেখে রাখবি। আমি ভালো আছি। পায়ে একটু আরাম পেয়েছি। একদম চিন্তা করবি না। আমি খুব দ্রুত আসব। কেন নিষেধ করেছি আসতে, তা নিয়ে মাথা ঘামাস না। আমি একদিন তোকে সব বলব। এখন আমার কথাটা রাখ। এমুখো হস না। আমি ভালো আছি। আবার ভাবিস না আমি কোনো বিপদে আছি। শুনবি কিন্তু আমার কথা। আমার কথা অমান্য করলে আমার সঙ্গ আর পাবি না, মনে রাখবি। খাওয়াদাওয়া করবি ঠিকমতো। নামাজ পড়বি। ঘরের কাজকর্মে হাত লাগাবি।


ইতি


তোর আপা


লেখাগুলো এলোমেলো, অগোছালো। মনে হচ্ছে তাড়াহুড়ো করে লিখেছে অথবা অনেক কষ্টে লিখেছে একেকটা অক্ষর। কপালে ছড়িয়ে থাকা এক গাছি চুল কানে গুঁজে পূর্ণা আবার চিঠিটা পড়ল। পড়ার পর এতটুকু নিশ্চিত হয়েছে যে তার বোন ভালো নেই।


বড়ো বিপদে আছে সে!