শিউরে উঠল সে ঢোক গিলল। তারপর আয়তুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিল। আয়তুল কুরসি যতবার সে পড়ে ততবার নিজের মধ্যে একটা শক্তি অনুভব করে, ভরসা পায়। এই মুহূর্তেও তার ব্যক্তিক্রম হয়নি।


সামনে এগোতে এগোতে একসময় আবিষ্কার করল, তার পায়ের নিচে মাটির বদলে অন্যকিছু আছে! চকিতে পদ্মজার মস্তিষ্ক চারগুণ গতিতে সচল হয়ে উঠল। সে পায়ের নিচের লতাপাতা সরাতে গিয়ে দেখে, এই লতাপাতাগুলোর শেকড় নেই! পদ্মজা দ্রুতগতিতে সব লতাপাতা সরাল। তখনই আবছা আলোয় চোখে ভেসে উঠল লোহার মেঝে! পদ্মজার মুখে একটি গাঢ় বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠে, উত্তেজনা বেড়ে যায়। শীতল শরীর উত্তেজনায় ঘামতে শুরু করেছে। লোহার মেঝেটা খুব একটা বড়ো নয়। পদ্মজা টর্চ জ্বালিয়ে খুঁটিয়ে, খুঁটিয়ে দেখে নিলো একবার। এক পাশে ছিদ্র রয়েছে। এখানে হয়তো চাবি ব্যবহৃত হয়! চকিতে পদ্মজার মাথায় এলো আলমগীরের দেয়া চাবিটার কথা। সে দ্রুত পেটিকোটের দুই ভাঁজ থেকে চাবিটি বের করল। প্রবল উত্তেজনায় তার হাত মৃদু কাঁপছে। বিসমিল্লাহ বলে, ছিদ্রে প্রবেশ করাল চাবি।


কাজ করল চাবিটা! পদ্মজা বিস্ময়ে বাকহারা হয়ে পড়ে! কী হতে চলেছে? সে লোহার এই অংশটি দুই হাতে তোলার চেষ্টা করে। যতটা ভারি ভেবেছিল, ততটা নয়! দেখে লোহার মনে হলেও, বোধহয় আসলে লোহার না। ধীরে ধীরে পদ্মজা আবিষ্কার করল, এটি একটা দরজা, গুপ্ত কোনো ঘরের দরজা। আতঙ্কে হিম হয়ে গেল সে। নিচের দিকে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে। পদ্মজা তার কাঁপতে থাকা পা এগিয়ে দিল ভেতরে। ভয় যে একেবারে পাচ্ছে না, তা না! খুব ভয় হচ্ছে। এমন আচানক ঘটনার সম্মুখীন তো আগে হয়নি। সিঁড়ি ভেঙে অনেক দূর নেমে এলো সে। ভীষণ ঠান্ডা এদিকে। মনে হচ্ছে সব স্বপ্ন! কোনো রূপকথার গল্পের রাক্ষসপুরীতে চলে এসেছে! চোখের সামনে ভেসে উঠে আরেকটি দরজা। এই দরজাটি অদ্ভুত ধরনের। তাদের ঢাকার বাড়িতে হুবহু একইরকম দরজা আছে! এই দরজার আড়ালে যাই হোক না কেন, বাইরে শব্দ আসে না! পদ্মজা অস্পষ্ট একটা সন্দেহে বিভোর হয়ে ওঠে I


এই দরজাটা খুলতেও কাজে এলো আলমগীরের দেয়া চাবিটা! চাবিতে চুমু খেল পদ্মজা। এত গুরুত্বপূর্ণ চাবি আলমগীর তাকে দিল কেন? এসব ভাবার সময় এখন নয়। বাকিটুকুও তাকে দেখতে হবে। দরজা খুলে অন্য একটি অংশে প্রবেশ করতেই মুখে তীব্র আলো ধাক্কা খেল। পদ্মজা কপাল কুঁচকে দুই হাত সামনে বাড়িয়ে আলোর গতিবেগ রোধ করে মুখে অস্ফুট বিরক্তিসূচক শব্দ করল। তারপর ধীরে ধীরে তাকাল চোখ পিটপিট করে। চারিদিকে রং-বেরঙের বাতি জ্বলছে। এই বাতিগুলোও তার চেনা। তাদের বাড়িতে আছে। যখন বিদ্যুত থাকে না, ব্যাটারিচালিত এই বাতিগুলো পুরো বাড়ি আলোয় আলোয় ভরিয়ে তোলে! দুইদিকে আরো দুটো দরজা। প্রথম দরজাটিতে লেখা ‘স্বাগতম’। দ্বিতীয়টিতে লেখা ‘ধ-রক্ত।’


রুম্পা তো এমন কিছুই বলেছিল!


পদ্মজা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্বিতীয় দরজাটির দিকে এগিয়ে গেল। এটার তালা নেই। তাহলে খুলবে কী করে? ধাক্কা দিল পদ্মজা, সঙ্গে সঙ্গে খুলেও গেল দরজা। পদ্মজার মুখ হাঁ হয়ে যায়, ঠোঁট বার বার শুকিয়ে যাচ্ছে। এ কোথায় এসেছে সে! আর কি ফিরতে পারবে নিজের ঘরে? আচমকা পদ্মজার কানে ভেসে আসে মেয়েদের কান্নার চিৎকার! পদ্মজার রক্ত হিম হয়ে যায়। এরকম একটা জায়গায় এতগুলো মেয়ে কেন কাঁদছে? কত কষ্ট, যন্ত্রণা সেই কান্নায়! কান্নার বেগ বাড়ছে। যেন বিরতিহীনভাবে আঘাত করছে কেউ। পদ্মজা দুই হাতে ছুরি আর রাম-দা শক্ত করে ধরল। তারপর সেই কান্না অনুসরণ করে এগিয়ে গেল সামনে।


যত এগুচ্ছে কান্নাগুলো তীব্র ধাক্কা দিচ্ছে বুকে। নিশ্বাস আটকে আছে পদ্মজার। সে চলে এসেছে খুব কাছে। চোখের সামনে আরেকটা ঘরের দরজা, একটু খোলা ওটা। সে সাবধানে দরজা ঠেলে ঘরের ভেতর তাকাল। আর ঠিক তখনই তার পায়ের পাতা থেকে মাথার তালু অবধি শিরশির করে উঠল। চোখের সামনে দেখা দৃশ্যটা দুঃস্বপ্ন বলে মনে হতে লাগল। মনে হচ্ছে জায়গায় জমে গেছে সে!


বিবস্ত্র অবস্থায় পাঁচ-ছয়টি মেয়ে হাতজোড় করে কাঁপছে, কাঁদছে। তাদের শরীর রক্তাক্ত। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা লম্বা শ্যামবর্ণের দেহ। গায়ে শার্ট নেই। প্যান্ট নেমে এসেছে নাভির অনেক নিচ অবধি। তার হাতে বেল্ট! সম্ভবত বেল্ট দিয়েই মেয়েগুলোকে আঘাত করছিল! প্রশস্ত ও হৃষ্টপুষ্ট শরীরের গড়নের মানুষটিকে চিনতে পেরে পদ্মজার বুকের পাঁজর টনটন করে উঠল। তার হাত থেকে পড়ে যায় ছুরি ও রাম-দা। বিকট শব্দ হলো একটা। সেই শব্দ অনুসরণ করে উপস্থিত মানুষগুলোর চোখ ছুটে গেল দরজার দিকে। পদ্মজা ধপ করে বসে পড়ে মাটিতে। শরীরের সবটুকু শক্তি নিমিষেই কে যেন শুষে নিয়েছে!


পদ্মজাকে দেখে মানুষটির চোখ হিংস্র জন্তুর মতো জ্বলজ্বল করে উঠল কপালের শিরা ভেসে ওঠে, হিংস্র চাহনিটা যেন মূহূর্তে হয়ে উঠল আরো ভয়ংকর। সে ভাবতেই পারছে না, পদ্মজা এত দূর চলে এসেছে! পদ্মজা বিস্ময়ভরা ছলছল চোখ দুটি সেই মানুষটার দিকে তাক করে অস্পষ্ট স্বরে বলল, ‘ছি!’